সিলেট-ঢাকা রেললাইন : লক্কর-ঝক্কর ট্রেন, জোড়াতালির পথ চলা

এম. এ. কাইয়ুম, মৌলভীবাজার ::  গত ২৩ জুন কুলাউড়ার বরমচাল এলাকায় দুর্ঘটনায় কবলিত হয় ঢাকাগামী আন্ত:নগর ট্রেন উপবন। ঘটনাস্থলেই নিহত হন ৪জন। আহত হয়েছে দুই শতাধিক যাত্রী। এ ঘটনার ১৫ দিনের মাথায় ৭ জুলাই গরুর সাথে ধাক্কা লেগে ঢাকাগামী আন্ত:নগর টেন জয়ন্তিকার ইঞ্জিন বিকল হয় যায়। গত ১৭ জুলাই ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা আন্ত:নগর ট্রেন কালনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া আসার পর ছেড়ে যায় ব্রেকের তার। প্রায় ১ ঘন্টা সময় ক্ষেপণ শেষে বেশি করে তার লাগিয়ে তোড়াতালি দিয়ে সিলেটের উদ্দ্যেশে ছেড়ে যায় ট্রেন।

গরুর সাথে ধাক্কা লেগে বিকল হওয়া জয়ন্তিকা শুক্রবার দুপুর (১৯ জুলাই) সিলেট-কুলাউড়া আউটার সিগন্যালের কাছে লাইনচ্যুত হয় একটি বগি। লাইনচুত্য হওয়ার পরও ট্রেন চালক ট্রেনটি না থামিয়ে লাইনচুত্য বগিটি স্লিপারের ওপর দিয়ে স্টেশন প্লাটফর্মে নিয়ে আসেন। এঘটনায় প্রায় ১০-১৫ জন ট্রেন যাত্রী আহত হয়েছেন। আর রেললাইনের প্রায় ৩শ মিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শেষে লাইনচ্যুত বগি রেখেই ২ ঘণ্টা পর ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় ট্রেন।

এদিকে একের পর এক রেল দুর্ঘটনায় আতংক দেখা দিয়েছে রেলযাত্রীদের মাঝে। আচমকাই ট্রেনের যাত্রীর সংখ্যা তুলনামূলক কমে গেছে। তাদের মতে লক্কর-ঝক্কর ট্রেনগুলো জোড়াতালি দিয়ে চলছে। যেকোন সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আখাউড়া-সিলেট রেলপথে পারাবত, জয়ন্তিকা, পাহাড়ীকা, উদয়ন, উপবন ও কালনী এক্সপ্রেস নামের ৬টি আন্তঃনগর ট্রেন প্রতিদিন গড়ে ১২বার চলাচল করে।

জানা যায়, শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় সিলেট থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী আন্ত:নগর জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ট্রেনটি দুপুর ১২টায় কুলাউড়া রেলওয়ে স্টেশনে প্রবেশকালে উত্তর পার্শ্বে ঞ বগি লাইচ্যুত হয়। এসময় বিকট শব্দ হলে ট্রেনে থাকা যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। ট্রেন থামার পূর্ব মুহুর্ত হওয়ায় গতি ছিলো কম, ফলে হতাহতের কোন ঘটনা ঘটেনি।

কুলাউড়া স্টেশন মাস্টার মো. মুহিব উদ্দিন জানান, লাইনচ্যুত বগিটি রেখে প্রায় ২ ঘন্টা পর বেলা ২টায় আন্ত:নগর জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ট্রেন ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।

এ ব্যাপারে এসএসআই সিগন্যাল মো. হুমায়ুন কবির পাটোয়ারী দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে জানান. প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে হিলব্লক ছুটে দুর্ঘটনা কবলিত হয়। তবে তদন্ত সাপেক্ষে বাকিটা নিশ্চিত হওয়া যাবে।

সিলেট-আখাউড়া রেলপথের ১৭৯ কিলোমিটারের মধ্যে ১৩টি সেতু মরণফাঁদ। যদিও সচেতন মহলের মতে এই সেকশনের সবগুলা সেতুই ঝুঁকিপ‚র্ণ৷ রেলওয়ের তালিকায় থাকা এই ১৩টি সেতুর ওপর ট্রেন পারাপারে ‘ডেড স্টপ’ (সেতুর আগে ট্রেন থেমে যাবে, এরপর পাঁচ কিলোমিটার গতিতে চলা শুরু করবে) ঘোষণা করা হয়েছে। সিলেট থেকে মোগলাবাজার স্টেশন পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে আটটি এবং মোগলাবাজার থেকে আখাউড়া পর্যন্ত ১৬৪ কিলোমিটারের মধ্যে পাঁচটি সেতু ‘ডেড স্টপ’ এর আওতাধীন।

এই রুটে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হয় ট্রেন। তবুও টনক নড়েনি কর্তৃপক্ষের।

রেলওয়ের প্রকৌশল শাখা সূত্রে জানা যায়, সিলেট-আখাউড়া সেকশনের ঝুঁঁকিপূর্ণ সেতুগুলোর মধ্যে রয়েছে শমসেরনগর-টিলাগাঁও সেকশনের ২০০ নম্বর সেতু, মোগলাবাজার-মাইজগাঁও সেকশনের ৪৩, ৪৫ ও ৪৭ নম্বর সেতু, কুলাউড়া-বরমচাল সেকশনের ৫ ও ৭ নম্বর সেতু, সাতগাঁও- শ্রীমঙ্গল সেকশনের ১৪১ নম্বর সেতু, শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সেকশনের ১৫৭ নম্বর সেতু, মাইজগাঁও-ভাটেরাবাজার সেকশনের ২৯নং সেতু এবং মনতোলা-ইটাখোলা সেকশনের ৫৬ নম্বর সেতু। সেতু সংস্কারের কোনো প্রকল্প না থাকায় এগুলো সংস্কার হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা।

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় জোনের তথ্য মতে, আখাউড়া-সিলেট রেলপথে পারাবত, জয়ন্তিকা, পাহাড়ীকা, উদয়ন, উপবন ও কালনী এক্সপ্রেস নামের ৬টি আন্তঃনগর ট্রেন প্রতিদিন গড়ে ১২বার চলাচল করে। এসব যাত্রায় প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ হাজার যাত্রী সিলেট-আখাউড়া রেল সেকশন নিয়ে সিলেট-ঢাকা এবং সিলেট-চট্টগ্রাম পথে ভ্রমণ করেন। রেল পথে যারা ভ্রমণ করেন তাদের বেশির ভাগই রেলকে বেছে নেন নিরাপদ যাত্রার মাধ্যম হিসেবে। কিন্তু বারবার যান্ত্রিক ত্রুটি ও দুর্ঘটনার কারণে এই রেলপথে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের অপশনে ক্লিক করুন 👎👎👎

এ জাতীয় আরও সংবাদ 👇