abdul hoq

মুক্তিযোদ্ধের স্মৃতিচারণ

মো. আবদুল হক :: ৭ই মার্চ ১৯৭১ বঙ্গবন্ধুর ভাষণে অর্থাৎ স্বাধীনতার ডাকে আমরা এলাকার কতিপয় ছাত্র যুবক উদ্ধুদ্ধ হয়ে শহীদ ছাত্রনেতা গিয়াস উদ্দিন ভাইয়ের নেতৃত্বে যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। আমরা ১২ জনের একটি দল দিরাই হইতে নৌকাযোগে ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করিলাম। যথাক্রমে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার কলকলিয়া ইউনিয়নের শ্রীধরপাশা গ্রামের শহীদ গিয়াস উদ্দিন, একই ইউনিয়নের সাদিপুর গ্রামের মোহাম্মদ আব্দুল হক, একই এলাকার মৃত ইয়াকুব আলী, একই গ্রামের মৃত আব্দুল হেলিম, বালিকান্দি গ্রামের ও কলকলিয়া ইউনিয়নের একাধিক বারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলামের ছোট ভাই মো. সফিকুল ইসলাম, চেয়ারম্যান সিরাজের আত্মীয় মোল্লারগাঁও গ্রামের মো. মোজাহিদ অালী মজুমদার, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার দরগাপাশা ইউনিয়নে হলদারকান্দি গ্রামের সফিকুল ইসলাম মাষ্টার, একই গ্রামের মো. বশির উদ্দিন মাষ্টার, বীরকলস গ্রামের বিধান চন্দ্র রায়, সত্যভূষন দাস, হলদারকান্দির মৃত মো. অাব্দুল হেকিম, বীরকলসের কাচামন দাস।

আমরা সবাই ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা পথে জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনা লক্ষীপুর গ্রামের কুখ্যাত দালাল লাল মিয়ার হাতে ধরাপড়ে যাই। সে অামাদের উপর অমানসিক নির্যাতন চালায়।আমাদের টাকা-পয়সা লুটে নেয় এবং অর্ধনগ্ন অবস্থায় ফেলে রাখে। আমাদের দলনেতা গিয়াসউদ্দিন ভাই তার হাত পায়ে ধরে কাকুতি মিনতি করে আমাদের উদ্ধারের জন্য চেষ্টা করেন। আমাদের নৌকা তল্লাশী করে কোনো অস্ত্র পায়নি। আমাদের শরীর পরীক্ষা করে ট্রেনিংয়ের কোনো চিহ্ন পায়নি। পরে হুংকার দিয়ে বলে যায় এই হাত ও অস্ত্র দিয়ে ১৬০ জন মানুষ হত্যা করেছি। আর আজ তোমরা ১২ জনকে হত্যা করে ১৭২ জন পূর্ণ করব। ভয়ে আমাদের সবার প্রাণ প্রায় অষ্টগত-কালিমা পড়ামত বাকশক্তি হারিয়ে ফেলি। সারাদিন নির্যাতনের পরে সন্ধ্যার দিকে ছেড়ে দেয়। সত্যি ছেড়ে দিচ্ছে না উপহাস করছে, অামরা বিশ্বাস করতে পারতেচিনা। পরিশেষে দেখলাম অাল্লাহপাক অামাদের সাক্ষাৎ ঝমের হাত থেকে রক্ষা করলেন। আমরা যার যার বাড়ী ঘরে ফিরলাম। আর সিদ্ধান্ত নিলাম যে ভাবে পারি ভারত পৌঁছার চেষ্টা করব।

কয়েক দিন পর আমি ও শহীদ গিয়াস উদ্দিন ভাই একটি ছোট নৌকা আর একজন মাঝি ভাড়া করে ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। সারাদিন নৌকা বেয়ে বিকাল ৫ ঘটিকায় সীমান্ত এলাকা পলাশের ধনপুরে পৌঁছে গেলাম। আর মাঝিকে তার টাকাসহ ঐখান থেকে বিদায় দিলাম। আমাদেরকে যাচাই বাছাই করে আশ্রয় শিবিরে স্থান দেওয়া হলো। ১৫ দিন পরে আমাদেরকে ট্রেনিং সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়ি এলো। ঐ গাড়িতে আমরা যারা ছিলাম তন্মধ্যে কয়েকজনের নাম স্মরণ আছে। আমি গিয়াস উদ্দিন ভাই, আবু হেনা ভাই, খলিল ভাই, জালাল ভাই, হারুন ভাই, কাইয়ুম ভাই ও আতর আলী গং।

পাহাড়ের উচু নিচু আকা বাকা রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলছিল। রাতের দিকে গাড়ি শিলং যাত্রা বিরতি নিলো। ঐখানের সেনানিবাসে আমরা রাত কাটালাম। ভোরে গাড়ি আমাদেরকে নিয়ে আসাম প্রদেশের মেঘালয় রাজ্যের ইকোওয়ানের জুয়াই ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করল। সময় মত গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম।আমাদের ট্রেনিং শুরু হলো। রাইফেল, এস, এল, আর, এল এমজি, স্টেনগান, এসএমজি, গ্রেনেড মাইন্ড ইত্যাদি ট্রেনিং দেওয়া হলো।

২৮ দিন ট্রেনিং এর পরে ২৮ ইন্ডিয়ান রুপি, অস্ত্র, কাপড় চোপড়, সহ বালাটে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। পথিমধ্যে শিলং সেনানিবাসে যাত্রা বিরতি। পরের দিন গাড়ি বালাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। পাহাড় ভেঙে রাস্তা ব্লক হওয়ায় গাড়ি আটকে গেল। আমাদেরকে হাঁটিয়ে বালাট নিয়ে আসা হলো। যদিও আমরা গেরিলা ট্রেনিং দিয়ে এসেছি। ইতিমধ্যে নতুন পুরাতনের সংমিশ্রণে সম্মূখ যুদ্ধের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। আমাদেরকে বিভিন্ন কোম্পানিতে ভাগ করে দেওয়া হলো। আমি ও গিয়াস উদ্দিন ভাই বি কোম্পানির ১নং প্লাটুনে স্থান পেলাম। প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন সাবেক ই, পি আর এর লোক মদন মিয়া।

শহীদ গিয়াস উদ্দিন ভাইকে প্লাটুন সহকারী কমান্ডারের দায়িত্ব দিলেন।

আমাদের প্লাটুনের অবস্থান সীমান্ত এলাকা নলুয়া গ্রামে ছিল। আমাদের ৫ নং সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর মীর শওকত আলী, সাব সেক্টরের কমান্ডার মেজর মুতাল্লিব, কোম্পানি কমান্ডার আব্দুর রাজ্জাক (ফোর্থ বেঙ্গল ) যথারীতি পাক সৈন্যদের সাথে আমাদের যুদ্ধ গুলি বিনিময় চলমান ছিল। হঠাৎ একদিন শেষ রাতের দিকে ১২ অক্টোবর ১৯৭১ আমরা পাক সৈন্য কর্তৃক তীব্র আক্রমণের শিকার হই। গুলি বিনিময়ের এক পর্যায়ে প্লাটুন কমান্ডার মদন মিয়া গুলিবিদ্ধ হন।পলায়নরত অবস্থায় গিয়াস উদ্দিন ভাই পাক শত্রুদের হাতে ধরা পড়েন। আমি নুরুল ইসলাম ভাই, আকবর ভাই পিছু হটার একপর্যায়ে দেখতে গেলাম এক পাক সেনা নুরুল ইসলাম ভাইয়ের দিকে গুলি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমি দেরি না করে তার দিকে গুলি ছুড়ে দেই৷ আমার গুলিতে সে মারা যায়। আর নুরুল ইসলাম ভাই মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পান।সারাদিনের যুদ্ধ শেষে আমরা ভারত সীমান্তে পৌঁছে গেলে যুদ্ধ থেমে যায়। তৎক্ষণাৎ খবর পেলাম আমাদের মদন স্যার শহীদ হয়ে গেছেন। তখন ১নং প্লাটুনের দায়িত্ব পান সুনামগঞ্জের অচিন্তপুরের নুরুল ইসলাম । আর আমার উপর বর্তায় প্লাটুন সহকারী কমান্ডারের দায়িত্ব। পরিশেষে আমাদের বি কোম্পানি সহ সাব সেক্টর কমান্ডার মুতাল্লিব সাহেব বনগাঁও সাবেক ইপিআর ক্যাম্পে খাংলার হাওরের পাড়ে স্থানান্তিরত হই। সুনামগঞ্জ মুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা ঐখানে যুদ্ধরত ছিলাম। ঐখানে যুদ্ধরত অবস্থায় একদিন আমাদের সুনামগঞ্জ কলেজের তৎকালীন ছাত্রলীগের সেক্রেটারি শহীদ তালেব ভাই পাক সৈন্যদের হাতে ধরা পড়েন। ৬ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ শত্রুমুক্ত হয়।

পাক বাহিনীরা সুনামগঞ্জ হইতে পলায়নের সময় তালেব ভাই কৃপেশ সহ তিন জনকে আহসান মারা ব্রীজের নিচে গুলি করে হত্যা করে যায়। জয়কলস উচ্চ বিদ্যালয়ে উনাদের সৃতিসৌধ বিদ্যমান। (চলমান…)

লেখক
মো. আবদুল হক
সাবেক ডেপুটি কমান্ডার
জগন্নাথপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ।

মুক্তচিন্তা বিভাগে প্রকাশিত লেখা ও মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। লেখকের মতামত ও বিষয়বত্তু এর যথার্থ নিয়ে Sylheterkantha.com কোনো আইনগত বা অন্যান্য কোনো দায়বহন করবে না।

“মুক্তচিন্তা বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। লিখা পাঠাতে হবে munnapressjp@gmail.com -এই ঠিকানায়।”

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের অপশনে ক্লিক করুন 👎👎👎

এ জাতীয় আরও সংবাদ 👇